Friday, July 26, 2013

সাধারণ মেয়ে ---- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি অন্তঃপুরের মেয়ে,
           চিনবে না আমাকে।
তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েছি, শরৎবাবু,
               "বাসি ফুলের মালা'।
তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরণ-দশা ধরেছিল
               পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে।
পঁচিশ বছর বয়সের সঙ্গে ছিল তার রেষারেষি,
        দেখলেম তুমি মহদাশয় বটে--
               জিতিয়ে দিলে তাকে।
    নিজের কথা বলি।
বয়স আমার অল্প।
    একজনের মন ছুঁয়েছিল
           আমার এই কাঁচা বয়সের মায়া।
        তাই জেনে পুলক লাগত আমার দেহে--
    ভুলে গিয়েছিলেম, অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে আমি।
আমার মতো এমন আছে হাজার হাজার মেয়ে,
        অল্পবয়সের মন্ত্র তাদের যৌবনে।
        তোমাকে দোহাই দিই,
একটি সাধারণ মেয়ের গল্প লেখো তুমি।
           বড়ো দুঃখ তার।
        তারও স্বভাবের গভীরে
অসাধারণ যদি কিছু তলিয়ে থাকে কোথাও
           কেমন করে প্রমাণ করবে সে,
        এমন কজন মেলে যারা তা ধরতে পারে।
কাঁচা বয়সের জাদু লাগে ওদের চোখে,
        মন যায় না সত্যের খোঁজে,
    আমরা বিকিয়ে যাই মরীচিকার দামে।
    কথাটা কেন উঠল তা বলি।
        মনে করো তার নাম নরেশ।
সে বলেছিল কেউ তার চোখে পড়ে নি আমার মতো।
    এতবড়ো কথাটা বিশ্বাস করব যে সাহস হয় না,
           না করব যে এমন জোর কই।
    একদিন সে গেল বিলেতে।
           চিঠিপত্র পাই কখনো বা।
    মনে মনে ভাবি, রাম রাম! এত মেয়েও আছে সে দেশে,
           এত তাদের ঠেলাঠেলি ভিড়!
        আর তারা কি সবাই অসামান্য--
               এত বুদ্ধি, এত উজ্জ্বলতা।
    আর তারা সবাই কি আবিষ্কার করেছে এক নরেশ সেনকে
           স্বদেশে যার পরিচয় চাপা ছিল দশের মধ্যে।
    গেল মেলের চিঠিতে লিখেছে
           লিজির সঙ্গে গিয়েছিল সমুদ্রে নাইতে--
        বাঙালি কবির কবিতা ক' লাইন দিয়েছে তুলে
           সেই যেখানে উর্বশী উঠছে সমুদ্র থেকে--
               তার পরে বালির 'পরে বসল পাশাপাশি--
    সামনে দুলছে নীল সমুদ্রের ঢেউ,
               আকাশে ছড়ানো নির্মল সূর্যালোক।
        লিজি তাকে খুব আস্তে আস্তে বললে,
    "এই সেদিন তুমি এসেছ, দুদিন পরে যাবে চলে;
           ঝিনুকের দুটি খোলা,
               মাঝখানটুকু ভরা থাক্‌
        একটি নিরেট অশ্রুবিন্দু দিয়ে--
           দুর্লভ, মূল্যহীন।'
        কথা বলবার কী অসামান্য ভঙ্গি।
সেইসঙ্গে নরেশ লিখেছে,
    "কথাগুলি যদি বানানো হয় দোষ কী,
           কিন্তু চমৎকার--
হীরে-বসানো সোনার ফুল কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়।'
           বুঝতেই পারছ
একটা তুলনার সংকেত ওর চিঠিতে অদৃশ্য কাঁটার মতো
    আমার বুকের কাছে বিঁধিয়ে দিয়ে জানায়--
           আমি অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে।
    মূল্যবানকে পুরো মূল্য চুকিয়ে দিই
        এমন ধন নেই আমার হাতে।
    ওগো, নাহয় তাই হল,
        নাহয় ঋণীই রইলেম চিরজীবন।
পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি শরৎবাবু,
        নিতান্তই সাধারণ মেয়ের গল্প--
যে দুর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয়
        অন্তত পাঁচ-সাতজন অসামান্যার সঙ্গে--
           অর্থাৎ, সপ্তরথিনীর মার।
বুঝে নিয়েছি আমার কপাল ভেঙেছে,
        হার হয়েছে আমার।
কিন্তু তুমি যার কথা লিখবে
        তাকে জিতিয়ে দিয়ো আমার হয়ে,
           পড়তে পড়তে বুক যেন ওঠে ফুলে।
    ফুলচন্দন পড়ুক তোমার কলমের মুখে।
        তাকে নাম দিয়ো মালতী।
           ওই নামটা আমার।
           ধরা পড়বার ভয় নেই।
    এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে,
           তারা সবাই সামান্য মেয়ে।
               তারা ফরাসি জর্মান জানে না,
                   কাঁদতে জানে।
           কী করে জিতিয়ে দেবে।
    উচ্চ তোমার মন, তোমার লেখনী মহীয়সী।
        তুমি হয়তো ওকে নিয়ে যাবে ত্যাগের পথে,
           দুঃখের চরমে, শকুন্তলার মতো।
               দয়া কোরো আমাকে।
           নেমে এসো আমার সমতলে।
        বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাত্রির অন্ধকারে
দেবতার কাছে যে অসম্ভব বর মাগি--
           সে বর আমি পাব না,
কিন্তু পায় যেন তোমার নায়িকা।
    রাখো-না কেন নরেশকে সাত বছর লণ্ডনে,
        বারে বারে ফেল করুক তার পরীক্ষায়,
           আদরে থাক্‌ আপন উপাসিকামণ্ডলীতে।
        ইতিমধ্যে মালতী পাস করুক এম| এ|
               কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে,
        গণিতে হোক প্রথম তোমার কলমের এক আঁচড়ে।
           কিন্তু ওইখানেই যদি থাম
তোমার সাহিত্যসম্রাট নামে পড়বে কলঙ্ক।
    আমার দশা যাই হোক
        খাটো কোরো না তোমার কল্পনা।
    তুমি তো কৃপণ নও বিধাতার মতো।
মেয়েটাকে দাও পাঠিয়ে য়ুরোপে।
    সেখানে যারা জ্ঞানী, যারা বিদ্বান, যারা বীর,
           যারা কবি, যারা শিল্পী, যারা রাজা,
           দল বেঁধে আসুক ওর চার দিকে।
জ্যোতির্বিদের মতো আবিষ্কার করুক ওকে--
           শুধু বিদুষী ব'লে নয়, নারী ব'লে।
ওর মধ্যে যে বিশ্বজয়ী জাদু আছে
    ধরা পড়ুক তার রহস্য, মূঢ়ের দেশে নয়--
        যে দেশে আছে সমজদার, আছে দরদি,
               আছে ইংরেজ জর্মান ফরাসি।
মালতীর সম্মানের জন্য সভা ডাকা হোক-না,
        বড়ো বড়ো নামজাদার সভা।
মনে করা যাক সেখানে বর্ষণ হচ্ছে মুষলধারে চাটুবাক্য,
        মাঝখান দিয়ে সে চলেছে অবহেলায়--
               ঢেউয়ের উপর দিয়ে যেন পালের নৌকো।
        ওর চোখ দেখে ওরা করছে কানাকানি,
সবাই বলছে ভারতবর্ষের সজল মেঘ আর উজ্জ্বল রৌদ্র
           মিলেছে ওর মোহিনী দৃষ্টিতে।
(এইখানে জনান্তিকে বলে রাখি
           সৃষ্টিকর্তার প্রসাদ সত্যই আছে আমার চোখে।
               বলতে হল নিজের মুখেই,
        এখনো কোনো য়ুরোপীয় রসজ্ঞের
               সাক্ষাৎ ঘটে নি কপালে।)
        নরেশ এসে দাঁড়াক সেই কোণে,
    আর তার সেই অসামান্য মেয়ের দল।
           আর তার পরে?
তার পরে আমার নটেশাকটি মুড়োল,
        স্বপ্ন আমার ফুরোল।
           হায় রে সামান্য মেয়ে!
               হায় রে বিধাতার শক্তির অপব্যয়!
  ২৯ শ্রাবণ, ১৩৩৯

Sunday, July 7, 2013

রূপকথা --- আহসান হাবীব

খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে,
স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে।
এখানে রাতের ছায়া ঘুমের নগর,
চোখের পাতায় ঘুম ঝরে ঝরঝর।
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের,
আকাশের নীল রং ছাউনিতে এর।
পরীদের ডানা দিয়ে তৈরি দেয়াল,
প্রজাপতি রং মাখা জানালার জাল।
তারা ঝিকিমিকি পথ ঘুমের দেশের,
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের।
ছোট বোন পারুলের হাতে রেখে হাত,
সাতভাই চম্পার কেটে যায় রাত।
কখনও ঘোড়ায় চড়ে হাতে নিয়ে তীর,
ঘুরে আসি সেই দেশ চম্পাবতীর।
এই খানে আমাদের মানা কিছু নাই,
নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।

Friday, June 7, 2013

সুধা! --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

ভস্ম অস্পৃষ্ট
অ-অন্বিষ্ট দৃষ্টি ;
হাহাকার বোধ দ্বন্দ্ব
আহ্লাদ অংকুরে ঝরে!
অচিন পাখি
কোন সুরে গায়-
মেলায় যায় মিলায়ে!
গহীনের বাণী__ফুটে
তবে ফুলে!

জুন ২০১২

Sunday, June 2, 2013

একেই বুঝি মানুষ বলে --- সৈয়দ শামসুল হক

নষ্ট জলে পা ধুয়েছো এখন উপায় কি?
আচ্ছাদিত বুকের বোঁটা চুমোয় কেটেছি।
কথার কোলে ইচ্ছেগুলো বাৎসায়নের রতি,
মানে এবং অন্য মানে দুটোই জেনেছি।
নষ্ট জলে ধুইয়ে দেবে কখন আমার গা,
তোমার দিকে হাঁটবে কখন আমার দুটো পা?
সেই দিকে মন পড়েই আছে, দিন তো হলো শেষ;
তোমার মধ্যে পবিত্রতার একটি মহাদেশ
এবং এক জলের ধারা দেখতে পেয়েছি-
একেই বুঝি মানুষ বলে, ভালোবেসেছি।

বৈশাখী রাত্রির আগমনে --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

বৈশাখের ঝাপটায় জল-ধুলোয় একাকার
পড়ন্ত বিকেলে আলস্যে বৈশাখী হাওয়া
চারিপাশে, ছুয়েঁ যায় বৃষ্টির রাশি
আকাশ গর্জে এলো বৃষ্টি
পড়ন্ত বিকেলে ঝরছে আবেগ, ভালোলাগা
বৃষ্টির ভাজেঁ ভাজেঁ ঝরছে প্রেম
ভিজেঁ একাকার তুমি,আমি আর প্রেম
বৈশাখী এই রাত্রির আগমনে। 
.......................

২ বৈশাখ ১৪১৯, ১৫ এপ্রিল ২০১২

অন্যকথা --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

একদিন কথা ছিলো, অনেক অনেক কথা হতো
আজ কেন জানি কোন কথা নেই। 
একদিন অনেককিছুই আপন ছিলো 
আর এখন দূরযামী, দূরের জানি।
একসময় অনেকের কাছের কেউ ছিলো 
শূন্য ঘর ভরে ছিলো অনেকের আনাগোনায়
একেকদিন সন্ধ্যা কেমন দৌড়ে যেতো রাতে
এখন সব সময় সুদীর্ঘ
কথাহীন শব্দহীন দীর্ঘ বেলা যতো
একদিন তবে জীবন অন্যরকম!!
.......................

১১ চৈত্র, ১৪১৮, ২৫ মার্চ ২০১২

তোমার মাঝে আমারে দেখিনি বলে অন্ধ আজ --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

রাত্রির প্রেম কোন নিকুঞ্জবনে
জলের আরশিতে খুজেঁ খুজেঁ
স্বপ্ন সকাল সুর্য আলোর ঝলকানি 
নিশ্চহ্ন নতুনে পাখনায়
ভুলে যাই স্বপ্নে আকাঁ সময় 
পড়ন্ত বিকেলের সাথে সন্ধি করেনি
দুপুরের রোদের সোনালি ক্ষণ
গোধূলী রঙে অ-অনুরূপ
রাত্রির প্রেম কোন নিকুঞ্জবনে
জলের আরশিতে খুজেঁ খুজেঁ
স্বপ্ন সকাল সুর্য আলোর ঝলকানি 
নিশ্চহ্ন নতুনে পাখনায়
..........................


২০ মার্চ ২০১২

ভেলা ভেসে যায় --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

সেই আকুল দৃষ্টি, আনচান ভাব
বুঝি সে গেছে দূরে
সেই উন্মীলিত আবেগ অনভূতি জাগে না 
বসন্তের আলোড়নে
অন্যরূপে অন্যভবে মিশেছো আলিঙ্গনে
আর হয়তো বলবে না কথা
তথাপি হৃদয় ভাবে

১৮ মার্চ ২০১২

সন্ধ্যায় স্মৃতি --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

ফিঁকে হয়ে আসা স্মৃতিরা
জেগেছে শোধ নিবে বলে
অনেক দেনা
পাওনার খাতা শূণ্য গোল
অনেক আকুতির পর জেগেছে
জীর্ণ ঝরা মলিন স্মৃতিদের কথা প্রশ্ন
অনেক আকাঙ্খা পর ফিরত চায়
এতোদিনের জমা সব দেনার শোধ নিবে
বলে, আর কতো? 
ভাবেনি এইখানেও অনেক পাওনা অদেয়!!

১ চৈত্র,১৪১৮..১৫.৩.২০১২

আমি এখন তোমার কাছে --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

অগোচরে করেছ আপন
কেড়ে নিয়েছ আমায়
বসিয়েছ হৃদয় আসনে
সব ভুলে

তোমার নিবার্ক ঠোটঁ,
বিষন্ন দৃষ্টি,
অবাক চাহনি,
নির্ঘুম রাত,
এলো চুল,
ক্ষীণ ঝিমুনি,
ভাবনা, প্রকাশ
আকাঁবুকি
লোককছাপা
দ্বিধা-দ্বন্ধ,
বোধ,
সব বলে দেয়
আমি তোমার

জানে আকাশ বুঝে হাওয়া
বুঝে অগ্রহায়ণের ফসলের ক্ষেত,
নির্মল ফুল,

পার না ফেরাতে হৃদয়ের টান
ছুটে অবিরত
পার না যেতে দূরে
তোমার মাঝে আরেক তুমি
শুধু আমারেই ভাব
তুমি তা পার না এড়াতে
শত চেষ্টাতেও
আমার ভাবনাই করে বিচরণ

অজান্তেই
আমারে করেছ আপন


১৭ ই নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:৩১

(অসম্পাদিত)

পথিক --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

একবার এক নক্ষত্রকে বলেছি, তুমি কি সুখী/
সে বললো তোমরা সবাই এমনই প্রশ্ন করো কেন?
বললাম আমি কে ?
সে বললো এই অনন্তের পথের পথিক তুমি, বয়ে যাও।
আবার বললাম সুখ কি,
নক্ষত্র বললো বয়ে যাওয়া, তবুও মন ভরলো না,
সে আরো কি জানি বললো আর আমার কান্না আসলো

৩ জৈষ্ঠ্য ১৪১৯, ১৭ মে.২০১২.দুপুর

নীরবানুভূতি --- আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

বিশালতার মূর্ত প্রতীক
বিমুগ্ধতায় দূর হতেই বুঝেছি উদারতা,
সবাক নির্বাক কতকিছুর সমারোহ,
পাহাড়, নিবারিত হয় তৃষ্ণা বুক চিড়ে
বয়ে যাওয়া ধারায়
বুকে ঠাঁই দিয়ে
আপন করেছে কতজনারে
গভীরে গিয়েছি
বিস্ময়ে দেখেছি কষ্ট ব্যথা
বইছো নীরবে,
এই ভেবে ভুলেছি কষ্ট
তবে সইতে পারি না.....

Friday, May 31, 2013

ভালোবাসার দিনে – সৈয়দ শামসুল হক

রাতের অন্ধকার এখন আমার ছবি আঁকার ক্যানভাস ।
তোমার চোখের আলো আমার রঙ ।
একদিন তোমাকে যে ছুঁয়েছি সেই আঙুল আমার তুলি এখন ।
আমি তোমার ঘুমের ছবি আঁকছি ।
তুমি নিলীন হয়ে শুয়ে আছো এখন আমার ছবির ভেতরে।
এই ঘুম থেকে তোমাকে আমি জাগবো না ।

অস্থির পৃথিবী থেকে তুলে এনে ভালবাসার দু’হাতে

তোমাকে এখন আমার স্থিরতার পটে স্থাপন করে চলেছি ।
পৃথিবীর সব রূপসীরা আমার পাশে দাড়িয়ে দেখছে তোমাকে,
আমি তাদের ঈর্ষা দিচ্ছি কেননা তারা স্থিরতা পায় নি ।
আমি একটু পরেই শুয়ে পড়বো তোমার পাশে -
তারপর একটু করে প্রান্তর ভরে উঠবে ঘাষে ।

কালের গ্রহণ লাগা চাঁদ তখন বেরিয়ে এসে

আমাদের দু’জনেরই ছবি আঁকবে- যে দেখবে সে দেখবে ।

আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায় – সৈয়দ শামসুল হক

আজ আমি যাব সেখানে,
দিগন্তের শেষ সীমান্তে,
অস্তমিত রবির শেষ আভা
ছোঁয়াবে যেখানে ঠিক সেখানে,
আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়।
গোধূলির লাল টিপ কপালে পরে,
কুয়াশার সাদা চাঁদর গায়ে জড়িয়ে,
বাতাসের দুরন্তপনার কাজল
দৃষ্টির তেপান্তরে এঁকে,
আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়।
গুচ্ছ পাতার মত  বুনন করে
কথামালা উপহার দেব বলে,
সন্ধ্যা প্রদীপের আলোর মত,
মিষ্টি আলো তোমার মনে ছড়াবো বলে,
আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়।।
যেখানে আছি আমি তোমার অপেক্ষায়,
প্রকৃতির  আদল অঙ্গে মেখে,
তোমার জন্য অতি সাধারণ সাজ-সজ্জায়,
এই গোধূলি বেলায়…
একটু উষ্ণ ভালবাসা দেবার একাগ্রতায়,
ঠিক সেখানটায়,
আসবে কি তুমি ?
এই অবেলায়…!!

পরানের গহীন ভিতর (৪) – সৈয়দ শামসুল হক

আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?-
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান ।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাশীঁর লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়,একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।

Friday, May 17, 2013

হাড়েরও ঘরখানি --- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

মানুষের প্রিয় প্রিয় মানুষের প্রানে
মানুষের হাড়ে রক্তে বানানো ঘর
এই ঘর আজো আগুনে পোড়ে না কেন?

ঘুনপোকা কাটে সে-ঘরের মূল-খুঁটি
আনাচে কানাচে পরগাছা ওঠে বেড়ে,
সদর মহলে ডাকাত পড়েছে ভর দুপুরের বেলা
প্রহরীরা কই? কোথায় পাহারাদার?

ছেনাল সময় উরুত দ্যাখায়ে নাচে
নপুংশকেরা খুশিতে আত্মহারা ।

বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
জাতির তরুন রক্তে পুষেছে নির্বীর্যের সাপ-

উদোম জীবন উল্টে রয়েছে মাঠে কাছিমের মতো।

২.
কোনো কথা নেই- কেউ বলে না, কোন কথা নেই- কেউ চলে না,
কোনো কথা নেই- কেউ টলে না, কোন কথা নেই- কেউ জ্বলে না-
কেউ বলে না, কেউ চলে না, কেউ টলে না, কেউ জ্বলে না।

যেন অন্ধ, চোখ বন্ধ, যেন খঞ্জ, হাত বান্ধা,
ভালবাসাহীন,বুক ঘৃনাহীন, ভয়াবহ ঋন
ঘাড়ে চাপানো-শুধু হাঁপানো, শুধু ফাঁপানো কথা কপচায়-
জলে হাতড়ায়, শোকে কাতরায় অতিমাত্রায় তবু জ্বলে না।
লোহু ঝরাবে, সব হারাবে- জাল ছিঁড়বে না ষড়যন্ত্রের?
বুক ফাটাবে, ক্ষত টাটাবে- জাল ছিঁড়বে না ষড়যন্ত্রের?

৩.
আমি টের পাই, মাঝ রাত্তিরে আমাকে জাগায় স্মৃতি-
নিরপরাধ শিশুটির মুখ আমাকে জাগায়ে রাখে
নিরপরাধ বধুটির চোখ আমাকে জাগায়ে রাখে
নিরপরাধ বৃদ্ধটি তার রেখাহীন করতর
আমাকে জাগায়ে রাখে।

মনে পড়ে বট? রাজপথ. পিচ? মনে পড়ে ইতিহাস?
যেন সাগরের উতলানো জল নেমেছে পিচের পথে
মানুষের ঢেউ আছড়ে দোহাই কূলে?
মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না কারো?
কি বিশাল সেই তাজা তরুনের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত
যেন ছিঁড়ে নেবে গ্লোব থেকে তার নিজস্ব ভূমিটুকু!

মনে কি পড়ে না ঘন বটমূল, রমনার উদ্যান
একটি কন্ঠে বেজে উঠেছিলো জাতির কন্ঠস্বর?
শত বছরের কারাগার থেকে শত পরাধীন ভাষা
একটি প্রতীক কন্ঠে সেদিন বেজেছিলো স্বাধীনতা।
হাতিয়ারহীন, প্রস্তুতি নেই, এলো যুদ্ধের ডাক,
এলো মৃত্যুর, এলো ধ্বংশের রক্ত মাখানো চিঠি।
গ্রাম থেকে গ্রামে, মাঠ থেকে মাঠে গঞ্জের সুবাতাসে
সে-চিঠি ছড়ায় রক্ত-খবর, সে-চিঠি ঝরায় খুন,
স্বজনের হাড়ে করোটিতে জ্বলে সে-চিঠির সে আগুন।

৪.
ভরা হাট ভেঙে গেল।
মাই থেকে শিশু তুলে নিল মুখ সহসা সন্দিহান,
থেমে গেল দূরে রাখালের বাঁশি, পাখিরা থামালো গান,
শ্মশান নগরী, খাঁ-খাঁ রাজপথে কাকেরা ভুললো ডাক।

প'ড়ে রলো পাছে সাত পুরুষের শত স্মৃতিময় ভিটে,
প'ড়ে রলো ঘর, স্বজনের লাশ, উনুনে ভাতের হাঁড়ি,
ভেঙে প'ড়ে রলো জীবনের মানে জ্বলন্ত জনপদে-
নাড়ি-ছেঁড়া উন্মুল মানুষের সন্ত্রাসে কাঁপা স্রোত
জীবনের টানে পার হয়ে গেল মানচিত্রের সীমা।

৫.
মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না তবু?
গেরামের সেই শান্ত ছেলেটি কী রোষে পড়েছে ফেটে
বন্ধুর লাশ কাঁধে নিয়ে ফেরা সেই বিভীষিকা রাত
সেই ধর্ষিতা বোনের দেহটি শকুনে খেয়েছে ছিড়ে-

মনে কি পড়ে না হাতে গ্রেনেডের লুকোনো বিস্ফোরণ?
তারও চেয়ে বেশি বিস্ফোরণের জ্বালা জ্বলন্ত বুকে
গর্জে উঠেছে শত গ্রেনেডের শত শব্দের মতো।

গেরামের পর গেরাম উজাড় উঠোনে উঠেছে ঘাস।
হাইত্ নের’ পরে ম’রে পড়ে আছে পালিত বিড়াল ছানা,
কেউ নেই, শুধু তেমাথায় একা ব্যথিত কুকুর কাঁদে।

আর রাত্রির কালো মাটি খুঁড়ে আলোর গেরিলা আসে-

৬.
ঝোপে জঙ্গলে আসে দঙ্গলে আসে গেরিলার
দল, হাতিয়ার হাতে চমকায়। হাত ঝলসায়
রোষ প্রতিশোধ। শোধ রক্তের নেবে তখতের
নেবে অধিকার। নামে ঝনঝায়-- যদি জান যায়
যাক, ক্ষতি নেই; ওঠে গর্জন, করে অর্জন মহা ক্ষমতার,
দিন আসবেই, দিন আসবেই, দিন সমতার।

৭.
দিন তো এলো না !
পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ছিঁড়ে নেয়া সেই ভূমি
দূর্ভিক্ষের খরায় সেখানে মন্বন্তর এলো ।
হত্যায় আর সন্ত্রাসে আর দুঃশাসনের ঝড়ে
উবে গেল সাধ বেওয়ারিশ লাশে শাদা কাফনের ভিড়ে,
তীরের তরীকে ডুবালো নাবিক অচেতন ইচ্ছায়।

৮.
আবার নামলো ঢল মানুষের
আবার ডাকলো বান মানুষের
আবার উঠলো ঝড় মানুষের

৯.
গ্রাম থেকে উঠে এলো ক্ষেতের মানুষ
খরায় চামড়া- পোড়া মাটির নাহান,
গতরে ক্ষুধার চিন্ মলিন বেবাক,
শিকড় শুদ্ধ গ্রাম উঠে এলো পথে।

অভাবের ঝড়ে-ভাঙা মানুষের গাছ
আছড়ে পড়লো এসে পিচের শহরে ।

সোনার যৌবন ছিলো নওল শরীরে
নওল ভাতার ঘরে হাউসের ঘর,
আহারে নিঠুর বিধি কেড়ে নিলো সব-
সোনার শরীরে বেচে সোনার দোসর ।

দারুন উজানি মাঝি বাঘের পাঞ্জা
চওড়া সিনায় যেন ঠ্যাকাবে তুফান।
আঁধার গতর জেলে, দরিয়ার পুত
বুকের মধ্যে শোনে গাঙের উথাল ।

তাদের অচেনা লাশ চিনলো না কেউ
ঝাঁক ঝাঁক মাছি শুধু জানালো খবর।

বেওয়ারিশ কাকে বলো, কার পরিচয় ?
বাংলার আকাশ চেনে, চেনে ওই জল
আমার সাকিন জানে নিশুতির তারা,
চরের পাখিরা জানে পাড় ভাঙা নদী
আমি এই খুনমাখা মাটির ওয়ারিশ ।

১০.
স্বপ্ন হারানো মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে
স্বজন হারানো মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে
ক্ষুধায় কাতর মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে
পোড়ায় নগরী, ভাঙে ইমারত, মুখোসের মুখ ছেঁড়ে
ছিঁড়ে নিতে চায় পরাধীন আলো প্রচন্ড আক্রোশে।

১১.
আমি কি চেয়েছি এতো রক্তের দামে
এতো কষ্টের, এত মৃত্যুর, এতো জখমের দামে
বিভ্রান্তির অপচয়ে ভরা এই ভাঙা ঘরখানি?
আমি কি চেয়েছি কুমির তাড়ায়ে বাঘের কবলে যেতে?

আর কতো চাস? আর কতো দেবো কতো রক্তের বলী?
প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে কি তোর লাগেনি লোহুর তাপ?
এখনো কি তোর পরান ভেজেনি নোনা রক্তের জলে?

ঝড়ে বন্যায় অনাহারে আর ক্ষুধা মন্বন্তরে
পুষ্টিহীনতা, জুলুমে জখমে দিয়েছি তো কোটি প্রান-
তবুও আসেনা মমতার দিন, সমতা আসেনা আজো।

১২.
হাজার সিরাজ মরে
হাজার মুজিব মরে
হাজার তাহের মরে
বেঁচে থাকে চাটুকর, পা-চাটা কুকুর
বেঁচে থাকে ঘুনপোকা, বেঁচে থাকে সাপ।

১৩.
খুনের দোহাই লাগে, দোহাই ধানের
দোহাই মেঘের আর বৃষ্টির জলের
দোহাই, গর্ভবতী নারীর দোহাই
এ-মাটিতে মৃত্যুর অপচয় থামা

আসুক সরল আলো, আসুক জীবন
চারিদিকে শত ফুল ফুটুক এবার।

১৪.
জাতির রক্তে ফের অনাবিল মমতা আসুক
জাতির রক্তে ফের সুকঠোর সসতা আসুক
আসুক জাতির প্রানে সমতার সঠিক বাসনা ।

Tuesday, April 30, 2013

অমলকান্তি --- নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৯৫



অপেক্ষা --- দিব্যেন্দু পালিত

অন্যমনে একদিন ভালোবাসা কড়া নেড়েযাবে;
অপেক্ষায় থেকো।
পদশব্দে মনে হবে বাতাসের নিষ্ঠুরশাসানি
বহুদূরে শাণ দিচ্ছে ভয়ানক কৌতুকের থেকে।
তোমার দু’পাশে রাস্তা, সাজানো হর্ম্যের
অলিন্দ থম্কে আছে, চারিদিকে আলোর চাতুরি
স্বপ্নের ভিতর কিংবা মৃত্যুর ভিতর কিংবা
জাগরণে, সূর্যের ভিতর
একাকী, নিঃসঙ্গ, এই আত্মঘাতী শোকের ভিতর
থেক, তবু অপেক্ষায় থেকো।

Wednesday, April 24, 2013

এক কোটি বছর তোমাকে দেখি না — মহাদেব সাহা

এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না
একবার তোমাকে দেখতে পাবো
এই নিশ্চয়তাটুকু পেলে-
বিদ্যাসাগরের মতো আমিও সাঁতরে পার
হবো ভরা দামোদর...
কয়েক হাজার বার পাড়ি দেবো ইংলিশ চ্যানেল;

তোমাকে একটিবার
দেখতে পাবো এটুকু ভরসা পেলে
অনায়াসে ডিঙাবো এই কারার প্রাচীর,
ছুটে যবো নাগরাজ্যে পাতালপুরীতে
কিংবা বোমারু বিমান ওড়া
শঙ্কিত শহরে।

যদি জানি একবার দেখা পাবো
তাহলে উত্তপ্ত মরুভূমি
অনায়াসে হেঁটে পাড়ি দেবো,
কাঁটাতার ডিঙাবো সহজে,
লোকলজ্জা ঝেড়ে মুছে
ফেলে যাবো যে কোনো সভায়
কিংবা পার্কে ও মেলায়;

একবার দেখা পাবো শুধু এই আশ্বাস পেলে
এক পৃথিবীর এটুকু দূরত্ব
আমি অবলীলাক্রমে পাড়ি দেবো।

তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন বৃহস্পতিবার
আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না

Tuesday, April 23, 2013

বাউলা বাতাস --- অতল জলের গান


বাউলা বাতাস আউলা চুলে লাগলো দোলা
গান ধরেছে পথের ধারে আত্মভোলা।
সে গানে সুর থাকেনা লয় থাকেনা
এমন সে গান—
তবু সে মন কেড়ে নেয়, প্রাণ কেড়ে নেয়
এমন সে টান।

পারেনা সবাই হতে বিন্দুধারী
পুরুষের উৎস জানি শুধুই নারী।
দেহ আর দেহের সুরে মনের ভাষায়
আপনাকে খুঁজে বেড়াই ভালোবাসায়।

নিজেতেই লীন হয়ে যাই দিন সারাটা
সাথী সেই সংগিনী আর দোতারাটা।
আঁধারে মগ্ন প্রেমে চাঁদের সাথে
পেয়েছি তোমার দেখা শুক্লারাতে।

Song Writer: Shawon Akond
Composer: Rahul Anand